জার্মানিতে বিভিন্ন অফিসের সার্ভিস অভিজ্ঞতা এবং ভাষাগত সমস্যা

Police Clearance Spain
স্পেনে স্টুডেন্ট ভিসার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স
December 20, 2017
ট্রেনে করে মেঘের দেশে (পর্ব ১)
August 4, 2018
জার্মানিতে বিভিন্ন অফিসের সার্ভিস অভিজ্ঞতা এবং ভাষাগত সমস্যা

জার্মানিতে আসার পরই বিভিন্ন অফিসে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল, ইন্সুরেন্স, ফরেইন অফিস, ফাইন্যান্স অফিস, ব্যাংক ইত্যাদি। পুরোপুরি মিশ্র অভিজ্ঞতা। সবার সাথে অভিজ্ঞতাগুলো না মিললেও আমার অভিজ্ঞতাগুলো একটু গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করলাম আশাকরি আপনাদের কাজে আসবে।

TK:

সবার প্রথমে ইন্সুরেন্স অফিসে গিয়েছিলাম নাম TK। এটা একটা সরকারী প্রতিষ্ঠান এদের সার্ভিস সবথেকে ভাল, জার্মান প্রবাসী যতজনের সাথে কথা হয়েছে একবাক্যে সবাই এদের সার্ভিসে সন্তুষ্ট এবং খুশি। আমিও খুবই খুশি। প্রথম দিন যাওয়ার পর বসে থাকলাম ওদের একজন আমার কাছে এসে বললো যে তিনি ইংরেজী ভাল জানেন না আরেকটু যেন অপেক্ষা করি ওদের ইংরেজী ভাল জানা অফিসার ফ্রি হলেই আমাকে ডাক দিবে। কথাবার্তা যথেষ্ট অমায়িক এবং ভদ্র, সার্ভিস খুবই দ্রুত এবং সব কাগজপত্র ঠিক সময়মত আমার ঠিকানায় পৌছেছিল এমনকি ঠিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন ইন্সুরেন্স কার্ড চলে আসে নতুন ঠিকানায় এদেরকে যা জানানোর প্রয়োজন পরে না। ফ্রিতে ডক্টরের সাথে এপয়েন্টমেন্ট ওরা ঠিক করে দিবে আপনার জন্য আপনি যদি ম্যানেজ করতে না পারেন। ওদের ফোন সার্ভিসও খুবই ভাল। জার্মানিতে আমি এদের সাথে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে সবথেকে ভাল বলবো।

Finanza:

এটা হল জার্মানির ট্যাক্স বিষয়ক অফিস, একদিন গিয়েছিলাম ওরা ভাল ইংরেজী বলতে পারছিল না কিন্তু আমার সাথে যথেষ্ট চেষ্টা করে আমার সমস্যা খন্ডন করে বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আমি এদের উপরেও খুশি। সার্ভিস ভাল হওয়ার জন্য ইচ্ছা থাকাটা যে জরুরী সেটা এরা প্রমান করেছে।

Deutsche Bank

আমি Deutsche Bank এ একাউন্ট করি আসার কিছুদিন পরই। ব্যাংকে যাওয়ার পর আমাকে এপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয় এবং একজন ইংরেজী জানা মানুষ এসাইন করে দেয়া হয়। সময় মত আমি ব্যাংকে আমার কাগজপত্র নিয়ে যাই যদিও পাসপোর্ট আর ছবি ছাড়া সম্ভবত আর কিছু দিতে হয় নি। আমাকে সবকিছু বুঝাতে বুঝাতে ভদ্রমহিলা অস্থির হয়ে যাচ্ছিল। যতটুকু দরকার তার থেকে বেশিই বলছিল। উনার ইংরেজীতে দ্রুততা ভাল হলেও বুঝানোর সক্ষমতা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন আছে তবে যথেষ্ট ডেডিকেটেড এবং ভাল সার্ভিস দিতে সচেষ্ট ছিলেন এবং পুরোপুরি প্রফেশনাল সার্ভিস পেয়েছি। উনার বিজনেস কার্ডও দিয়ে দিয়েছিল এবং বারবার বলছিল যেন কোন দরকারে তাকে ফোন দেই।

Ausländerbehörde (Foreigners Authority):

এক আজব চিরিয়া এই অফিস। এখানে একেকজনের অভিজ্ঞতা একেকরকম একেকজনের সাথে অভিজ্ঞতা একেকরকম। প্রথমদিন যাই আনমেলডুং বা ঠিকানা রেজিস্ট্রেশন করতে। প্রথমদিন বিনীতভাবে ইংরেজীতে কথা বলার অনুমতি চাইতেই উনি এপ্রুভ করলেন এবং বাকি আলোচনা আমরা ইংরেজীতেই চালালাম।

এর পরেরবার গিয়েছি মুলত Aufenthalskarte (Residence Permit) এর বিষয়ে, ১২০ নম্বর রুমে ঢুকে জার্মান ভাষায় কথা শুরু করে জার্মানে জিজ্ঞাসা করলাম “সে কি ইংরেজী বলে কিনা” সে সাফ জানিয়ে দিলো বলে না। জিনিসটাকে হালকা ফান হিসেবেই ধরে নিয়েছি কারন সে পরবর্তীতে আমার সাথে ইংরেজীতে কথা বলেছে এবং সে যথেষ্ট ফ্লুয়েন্ট। পরবর্তীতে তার কাছে কয়েকবার গিয়েছি এবং আমি আর কখনোই ইংরেজীতে কথা বলার অনুমতি না নিয়ে কথা শুরু করেছি এবং সবকিছুই ঠিক ছিল। অভিযোগের মধ্যে সে আমার কি কি করতে হবে ঠিকমত বলে নি তবে ধরে নিচ্ছি সে জানতো না। সো ফার তার সাথে অভিজ্ঞতা মোটামুটি এভারেজ। উনি ছুটিতে গেলে আমাকে অন্য একটা রুমে দেখা করতে যেতে হয় যিনি খুবই স্ট্রিক্ট এবং মুখের উপরে কোন প্রকার কমনীয়তা ছাড়া কথা বলছিলেন যদিও ভাষাগত কোন সমস্যা বা ইংরেজীতে কথা বলতে কোন অপারগতা প্রকাশ করেন নাই। অভিজ্ঞতা মোটামুটি খারাপ বলা যায়। আজকে আবার গিয়েছিলাম ওখানে প্রথমে নীচতলা থেকে একটা ছাড়পত্র টাইপের কিছু নিতে সেটা ঠিকমত নেয়া হলেও আমার স্ত্রীর ভিসাজনিত কাজে ২য় তলায় যাওয়ার পর সমস্যার সূত্রপাত হল। আমার এপয়েন্টমেন্ট ছিল ৯:৩০ এ। আমি ৯:০০ এর দিকে কেউ নেই দেখে রুমে ঢুকে জার্মানে শুরু করে তারপর ইংরেজীতে বললাম যে “আজকে আমার একটা এপয়েন্টমেন্ট আছে তুমি যদি চাও তাহলে আমি একটু আগেই আসতে পারি” ৫০ উর্ধ মহিলা পরিষ্কার ইংরেজীতে জানালেন তার আর কিছুক্ষন লাগবে রেডি হতে। কিছুক্ষন পর আমাকে ডাকতে নিজেই আসলো। আমি যাওয়ার পর সে পুরো জার্মানে কথা বলতে শুরু করলো। আমি তাকে ইংরেজীতে “Would you please talk in English” বলার পর উনি মনেহল ভালই রেগে গেলেন। আমাকে বললেন আমি কেন ট্রানস্লেটর নিয়ে আসি নাই। আমি জানালাম আমার কেউ নেই আসার মত। এবার আমাকে রীতিমত হুমকি দিয়ে বললেন সে দুমাস পর এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দিচ্ছে আমি যেন কাউকে নিয়ে তারপর আসি। আমি বিনীতভাবে বললাম দেখ আমার এখানে কেউ নাই যে আমার সাথে আসবে তুমি যদি এলাউ না করো তাহলে আমি দেশে চলে যাবো, আমি আমার স্ত্রীকে দেশে রেখে এখানে এভাবে থাকতে পারবো না। এবার উনি একটু নমনীয় হলেন এবং কাগজপত্র চাইলেন। ফর্ম পুরন করা ভূল কেন হয়েছে সেটা দেখেও একটু খেকিয়ে উঠলেন আমি বললাম “I am sorry for the unwanted mistake” এরপর উনি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হলেন এবং স্বাভাবিকভাবে কথা চালিয়ে গেলেন। এভাবে শেষ পর্যন্ত কাজ শেষ হল। উল্লেখ্য উনি ইংরেজী জানেন।

পুরো ঘটনাটা লক্ষ্য করলে দেখা যায় এটা এক প্রকার হেয়ালিপনা এবং নিজের ব্যাক্তিগত পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে পেশাগত বৈশিষ্ট বজায় না রাখা। ঘটনাগুলোর যে আমি একমাত্র আমার জন্যই হয় নাই তার প্রমান পাওয়া যায় গুগলে অফিসটির রিভিউ দেখলে। পার্শ্ববর্তী শহর Frankfurt এর রিভিউ দেখলেও সেরকমই খারাপ অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া যাচ্ছে। যদিও রিভিউ দেখে মনেহচ্ছে উদ্ধ্যত আচরনের জন্য আমার শহরের অফিসটিই বেশি খ্যাতি অর্জন করেছে। একজন ভদ্রলোকের রিভিউ দেখে, একজন মার্কিন নাগরিক এবং একজন এশিয়ান এর সাথে কথা বলে যা বুঝলাম এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশী বলে নয় বরং ভিন্ন ভাষাভাষীদের অভিজ্ঞতা এরকমই। এই ভদ্রলোকের রিভিউটা উল্লেখযোগ্য

This is the place where the myth of German efficiency is laid to rest”।

আমি আরও কয়েকজনের থেকে মতামত নিয়েছি, একজন মুনস্টেরে, দুজন বার্লিনে এবং ফ্রাঙ্কফুর্টের আছেন। সব মিলিয়ে কিছু পয়েন্ট বের করলাম তা হল।

  • যে শহরে বিদেশী খুবই কম থাকে বিশেষত জার্মান ভাষা জানে না এরকম বিদেশী কম থাকে তাদের অভিজ্ঞতা খারাপের হার বেশি।
  • বিদেশীদের নিয়ে যে অফিস সেখানে সবাই ইংরেজী চলনসই বলতে পারার কথা সবারই এবং এ পর্যন্ত যাদের সাথে কথা হয়েছে তারা সবাই ভাল ইংরেজী বলেন কিন্তু একজন জার্মান কেন পারে না সেটা তাদের কাছে একটা ইস্যুর মত।
  • অল্পবয়স্ক মানুষ থেকে বৃদ্ধ মানুষের সাথে খারাপ অভিজ্ঞতার পরিমান উল্লেখযোগ্য পরিমানে বেশি।
  • বড় শহরে সমস্যার পরিমান কম মনেহয়েছে আমার কাছে যদিও এটা বন্ধুবান্ধবের কাছে থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে শোনা।
  • তারা ভয়ংকর রকমের স্লো। চিঠিতে যে তারিখ লেখা তার ৫-৬ দিন পর হাতে এসে পৌছায়, কোন অজানা কারনে আমার একটা চিঠি ২৪ দিন পর আজকে আমার হাতে এসেছে যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ন একটা চিঠি।
  • আমার অফিসের HR যতবারই তাদের সাথে কথা বলেছে তারা প্রতিবারই পরিষ্কার উত্তর এবং করনীয় বলেছে যা আমার সাথে হয় নাই। প্রশ্ন জাগতেই পারে আমি বিদেশী এটাই কি একমাত্র কারন?

খারাপ অভিজ্ঞতার মাঝে ভাল অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আমার বন্ধুর কাজ তারা ১৫ দিন আগে করে দিয়েছিল তার সমস্যার কথা শুনে। উল্লেখ্য তার শহর আমার থেকে ভিন্ন। এরা স্লো কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত কাজ হয় বা তারা ফেলে রাখে না সময় হয়তো বেশি লাগবে। জার্মানি সম্পর্কে আমরা খুবই উচ্চ একটা ধারনা নিয়ে আসি কিন্তু সবশেষে একটা কথা বলতেই হয় আমাদের দেশে যেমন কিছু জেলা সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারনা বেশিসংখক মানুষের মধ্যে কাজ করে জার্মানরা তার বাইরে নয়। এদের মধ্যেও এই জিনিসটা বিদ্যমান যেটা কাটিয়ে উঠে পরিস্থিতি সামলে চলতে হবে। শিক্ষিত জার্মানদের ব্যবহার যথেষ্ট অমায়িক পেয়েছি তাই চাকুরিক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোন সমস্যার সম্পূখীন হতে হয় নাই। আমার বস এবং কলিগরা সবাই আমার এমন অভিজ্ঞতায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং তারাও এই অফিসের এমন আচরনে বিরক্ত তা উল্লেখ করেছেন সবকিছুর বিবেচনায় এটাকে একটা ছোট ব্যাপার বলেই ধরে নিচ্ছি কারন আমাকে প্রতিদিন এই অফিসে যেত হবে না। দেশে যেহেতু প্রায় প্রতিটা সরকারী সার্ভিসেই এরকম অভিজ্ঞতার স্বীকার আমরা সেহেতু এটুকু মেনে নেয়াই যায়।

পরামর্শঃ আমরা যারা দেশে থেকে এখানে আসি তারা স্বভাবতই জার্মান সেরকম শিখে আসি না বিশেষত, আমার মত যারা সরাসরি চাকুরি নিয়ে আসেন। চাকুরী পাওয়াটা হুট করেই হয়ে যায় তাই প্রস্তুতি নেয়ার মত সময় থাকে খুব কম। যারা এই অফিসে যাবেন অবশ্যই চেষ্টা করবেন জার্মান জানে এমন কাউকে সাথে নিয়ে যাওয়ার অথবা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে সামলে উঠার মত মানসিক প্রস্তুতি রাখা উচিত। চেষ্টা করা উচিত যতদুর সম্ভব জার্মান ভাষা শিখে আসার চেষ্টা করা এবং বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নেয়া।

আজকের মত এখানেই শেষ করছি, আপনাদের অভিজ্ঞতা কমেন্টে জানাতে পারেন তাতে অন্যদের উপকারে আসবে। আল্লাহ হাফেজ।

 

লেখক: আশিফ নেওয়াজ

পূর্বে লেখাটি লেখকের  ব্যক্তিগত ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে।

ফেসবুক মন্তব্য
Mahedi Hasan
Follow Me

Mahedi Hasan

স্বপ্নদর্শী ও ভ্রমণপিপাসু একজন মানুষ। নতুন কিছু শিখতে ও জানতে ভাল লাগে। নিজে যা জানি সেটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।
Mahedi Hasan
Follow Me
 
শেয়ার করুনঃ
Mahedi Hasan
Mahedi Hasan
স্বপ্নদর্শী ও ভ্রমণপিপাসু একজন মানুষ। নতুন কিছু শিখতে ও জানতে ভাল লাগে। নিজে যা জানি সেটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *