ইতালিতে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এবং কঠিন বাস্তবতা, ২০১৭-১৮ (শেষ পর্ব)

গত পর্বে আমরা VFS পর্যন্ত গিয়েছিলাম। আসলে VFS নিয়ে আমার রাগ খুব বেশি একটা ছিলো না, কিন্তু কেউ যদি নিজের কাজ সম্পর্কে নিজেই না জানে তারপর যদি সবজান্তার ভাব ধরে বসে থাকে, তাহলে অবশ্যই মেজাজ ধরে রাখা মুস্কিল। সে যাইহোক, আমরা আবার ভিসা আপ্লিকেশনে ফিরে যাই, ইতালিতে ভিসার আবেদন করতে হয় এম্বাসি প্রদত্ত চেকলিষ্ট অনুযায়ী ( ছবি দেখুন)।



যেখানে যেখানে টাকা পয়সা বেশী লাগে আমি শুধু সেই পয়েন্ট গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি। চেকলিষ্ট অনুযায়ী,
৭ নাম্বারঃ Copy of IOM verified documents- এইটা করতে ১২০০০-১৬০০০ টাকা লাগে। ঢাকা বোর্ড এবং ঢাকার ভিতরের বিশ্ববিদ্যালয় হলে কম লাগে।
৮ নাম্বারঃ Copy of legalized documents- এইটাই মুলত ইতালিয়ান ভাষায় ট্রান্সলেশন। এইটা করতে ১৫০০-২০০০ টাকা লাগে , সময় ১ মাসের মত।
৯ নম্বারঃ Forwarding letter from sponsor/ Sponsor Declaration- এইটা একজন উকিল কে দিয়ে করাতে হয় ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে। ৬০০ টাকার মত লাগে।
১০ নাম্বারঃ Air ticket booking copy- Airlines/ Travel Agency তে পরিচিত থাকলে ফ্রি করা যায়। না হলে ৫০০-১০০০ টাকা খরচ হয়।
১২ নাম্বারঃ Bank statement- ২৫০-৫০০ টাকা Bank statement। অনেক ব্যাংক নাকি ফ্রি দেয় কিন্তু কোন কোন ব্যাংক ফ্রি দেয় আমার জানা নেই।
১৩ নাম্বারঃ Student File- ব্যাঙ্কভেদে ৩৫০০-৬০০০ টাকা। ( EBL এ চার্জ সব ক্ষেত্রেই বেশি, Commercial Bank of Ceylon চার্জ নাকি কম কিন্তু সার্ভিস ভালো)
এছাড়াও Sponsor এর একাউন্ট এবং স্টুডেন্টের নিজের একাউন্টে ৮-১০ লাখ টাকা দেখাতে হয়।
** ভিসা আবেদন ফি – ৬৬০৫ টাকা (৬৬০৬ টাকাও হতে পারে)
** DOV এর সময় ৯২৫ টাকা লাগে।
চেকলিস্টে নাই কিন্তু লাগবে সেটা হলো হেলথ ইন্সুরেন্স। যেটার ব্যাপারে গত পর্বেই বলেছি। তাই আর নতুন করে কিছু বলছি না। আমার হিসাবটা একদম সলিড হিসাব। প্রতিটি কাজই আমি নিজে সশরীরে থেকে করেছি। তাই আমার খরচের থেকে আপনাদের কম খরচ হওয়ার সুযোগ খুবিই কম। এত গুলো কঠিন ধাপ পেরিয়ে আপনি ভিসার জন্য আবেদন করবেন এবং একটুর স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে চাইবেন তো? কারন খাটনিতে আর কম হবে না। ৬-৭ মাসেরও বেশি সময়ের প্ররিশ্রমের ফল পাবেন। তাই ফল দিতে ইতালিয়ান এম্বাসিও কার্পন্য করবে না, মাত্র ৩ দিনের মধ্যেই আপনার পাসপোর্টে রিজেক্ট সিলসহ রিজেকশন লেটার হাতে ধরিয়ে দিতে পারে।
বিশ্বাস হচ্ছে না??
আমি যেদিন পাসপোর্ট আনতে যায় আমার সামনের ছেলেকে ২ দিনে রিজেক্ট করেছে!! তাহলে এইবার আবেদনকৃত আরো কিছু প্রোফাইল বর্ণনা দেই যারা ২০১৭-১৮ সালে রিজেক্টেড হয়েছে , আপনার প্রোফাইল যদি তাদের থেকেও ভালো হয় তাহলে বলব আপনি ইতালিতে এপ্লাই করেন !!
ফেসবুকে আমাদের একটা সাব গ্রুপ ছিলো যারা বিভিন্ন গ্রুপ থেকে আড হয়েছিল। আমরা সবাই-ই DOV পেয়ে ভিসার জন্য আবেদন করেছিলাম।
১। একজনের Double A+, IELTS-7.0 বাবার মান্থলি ইনকাম ১.৫ লাক্ষের উপর। ফলাফল- রিজেক্টেড !
২।নামকরা পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। যেহুতু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাহলে CGPA এবং একাডেমিক ফলাফল সহজেই অনুধাবন করতে পারতেছেন নিশ্চয়, তাকে “ Migratory Risks” দেখিয়ে রিজেক্টেড !
৩। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট, IELTS-6.5, Offer letter From Ranked one Italian University. “Migratory Risks” দেখিয়ে রিজেক্টেড!
৪। আরো একজন Double Golden A+, IELTS-7.5, ফলাফল- রিজেক্টেড!
৫। আমার জানামতে, একজন ছিলেন ইতালিতে আবেদন করা এইবছরে সব থেকে হাই প্রফাইলধারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, IELTS-7.5 ,ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপ হোল্ডার তাকে “ Migratory Risks” দেখিয়ে ২ বার রিজেক্টেড ( ঠিকই পড়েছেন ২ বার রিজেক্টেড)। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, প্রায় সব গ্রুপেই এইটা প্রচার হয়ে গেছে এইবার ইতালি একজন ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপ হোল্ডার রিজেক্ট করেছে কিন্তু আমি সেই গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে একজন, যে উনাকে চেনে এবং উনার সাথে অসংখ্যবার কথা হয়েছে, তাই এইটা ভুল ইনফো হওয়ার কোন সুযোগই নেই।



এইবার নিজের সম্পর্কেই কিছু বলি, আপনারাই আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন ইতালি সম্পর্কে এত নেতিবাচক কথা বলার পরও আমি নিজে কেন আপ্লাই করলাম? এই প্রশ্নের উত্তর হলো, আমি বাংলাদেশের বেশ কিছু পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিলাম (Undergraduate এর সময়) কিন্তু সাব্জেক্ট মনপুত না হওয়ায় আমি অপেক্ষাকৃত নতুন পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এবং পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার “খায়েশ” আমার এখনো যায় নাই। আমার নরওয়ে থেকে অফার লেটার আসার পর নরওয়ের জন্যই পেপার প্রস্তুতি করছিলাম কিন্তু একটা ইমেইল দেখে চমকে যাই যেটা ইতালির “ University of Bologna” (https://goo.gl/pYRy4q) এর অফার লেটার ছিলো। ইতালির সব থেকে বিখ্যাত এবং ইউরোপের সবথেকে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় !! সত্যি কথা বলতে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমে পড়ে যায়। যেহুতু প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার ইচ্ছা ছিলো তাই University of Bologna জন্যই ভিসার আবেদন করি। মানে হলো, আমি দেশ নয় ভার্সিটিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম। এবং আমার Sponsorshipও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক স্ট্রং ছিলো, এবং আমার প্রতিটা পেপারস লিগাল ছিলো, তাই ভিসা নিয়েও কোন দুঃচিন্তা ছিলো না । কিন্তু ফলাফল- রিজেক্টেড !!
সর্বশেষ, আমরা যে ২০ জন আবেদন করেছিলাম সবাই রিজেক্টেড ২০১৭-১৮ সালের জন্য । এই ২০ জনের মধ্যে ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ি প্রথম ৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার ছিল বেশ কয়েক জনের কিন্তু সবাই রিজেক্টেড। আমরা সাড়াশি অভিযান চালিয়ে ছিলাম এইটা দেখার জন্য কেঊ ভিসা পাই কিনা, কিন্তু দুঃখের বিষয় একজনকেই পাই না যে বাংলাদেশ থেকে ভিসা পেয়েছে।
এবার খোদ ইতালিয়ান এম্বাসির খামখেয়ালিপনার একটু বর্ণনা দেইঃ
ছবিতে বক্স করে দেওয়া ডেটটা খেয়াল করুন । ইতালিয়ান এম্বাসি বাংলাদেশি স্টুডেন্টদের কে ডকুমেন্টস সাবমিট করতে বলছে ২০১৬ সালে কিন্তু এই সার্কুলার পাব্লিশই হয়েছে এপ্রিল, ২০১৭ তে !!! ব্যাপারটা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন? ইতালিয়ান এম্বাসি গত বছরের পিডিএফ টাই আপলোড করে দিয়েছে, নুন্যতম এডিট করার প্রয়োজন মনে করে নি। আমি ভিসা আপ্লিকেশন জমা দেই ৩ আগষ্ট ,২০১৭ তে আর University of Bologna আমাকে ১২ আগষ্ট ইমেইল করে জানায় ইতালিয়ান এম্বাসি আমার Pre-enrollment কমপ্লিট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পেপারস সেন্ড করেছে। আরে ভাই, ভিসায় যদি না দিবি তাহলে এই গুলো করার দরকার কি??? দ্বিতীয়ত, আমার রিজেকশন লেটারে লেখা ছিলো আমার মানি ট্রান্সফার ট্রেসেবল না। কিন্তু আমি মানি ট্রান্সফারের সব কাগজ জমা দিয়েছিলাম এবং ওই দিনই ব্যাঙ্কে গিয়ে খোজ নিয়ে জানতে পারি ওরা ব্যাঙ্কে কোন ভেরিফিকেশনই করে নাই !!
এবার আরো একটা মজার গল্প বলি, এই মুর্হুতে পৃথিবীর সব থেকে ক্ষমতাধর এম্বাসি হলো ইতালিয়ান এম্বাসি ,বাংলাদেশ! কি বিশ্বাস করলেন না, তাই তো?? ইতালিয়ান এম্বাসি ছেলেকে মেয়ে এবং মেয়ে কে ছেলে , এবং বাপকে ভাইও বানিয়ে দিতে পারে। পৃথিবীর আর কেউ পারবে, বলতে পারেন?? এইবার উদাহরণসহ বুঝিয়ে দেই,আমার এক ফ্রেন্ড আবেদন করেছিল যার স্পন্সর ছিল তার বাবা। কিন্তু এম্বাসি তার রিজেকশন লেটারে লিখেছে “ আপনার “ভাইয়ের” যথেষ্ট পরিমান আর্থিক সামর্থ নাই” দেখলেন কিভাবে বাপকে ভাই বানিয়ে দিল !!এই রকম আরও উদাহরণ আছে কিন্তু লেখাকে আর দীর্ঘায়িত করতে চাই না বলে বললাম না।
তাই আপনি যদি ইতালিতে পড়ার জন্য আবেদন করতে চান আমি বলব একবার বা দুইবার নয়, ১০০০ বার ভাবুন ডিসিশন নেওয়ার আগে। আর যদি যেকোন ভাবেই হোক ইতালি যেতে চান তাহলে বলব “ ইতালিতে আপনাকে স্বাগতম” !!!!!!
*** লেখাটি ২০১৭-১৮ সালের প্রেক্ষাপটে লেখা, আগামী বছর পরিস্থিতি বদলেও যেতে পারে কিন্তু আমার মতে সেই সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ । সম্ভবত ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশী দের জন্য জব ভিসাও বন্ধ আছে তাই খুব দ্রুত ইতালি বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা দিবে বলে মনে হয় না। তাই চিন্তা ভাবনা করেই ডিসিশন নেওয়া উচিত।
( বিঃদ্রঃ পোষ্টটি কপি-পেষ্ট করলে কার্টেসি দিলে খুশি হবো)। শুভ রাত্রি।
ফেসবুক মন্তব্য
Print Friendly, PDF & Email
Mahedi Hasan
 
শেয়ার করুনঃ

Mahedi Hasan

স্বপ্নবাজ ও ভ্রমণপিপাসু একজন মানুষ। নতুন কিছু জানতে ও শিখতে ভালো লাগে। নিজে যা জানি তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। আমার সম্পর্কেঃ http://www.hmahedi.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *